বর্ষবরণ ও বৃষ্টি বন্দনা!

আমার পছন্দ চৈত্রের আকাশের গগনবিদারী বর্ষণ, তাই বসন্তের পরে আসা বৈশাখী বৃষ্টিকে আলাদা করে কখনো দেখা হয়নি।এ বছর পুরো ঢাকা শহরবাসী যখন চৈত্র মাসের শিলাবৃষ্টিতে আচ্ছন্ন, আমার বাসার এদিকে তখন কেবলই গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টিপাত। কি যন্ত্রণা! আমার অফিসও যে আর মহাখালি বা গুলশানে নেই। একবার মনে করলাম, বৃষ্টি দেখার জন্য হলেও ওদিকটায় আবার কাজ খুঁজবো কিনা। দেখতে দেখতে চৈত্র শেষে বৈশাখের পদার্পণ ঘটলো। অন্যান্যবারের মতন এবার আর কোন নতুন শাড়ি কেনা হয়নি। দুপুরে দাওয়াত ছিল বিধায় বোনের একটা ঘিয়া শাড়ি লাল ব্লাউজের সাথে গায়ে চড়ালাম। একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল দাওয়াতে যেতে, তাই বিকেল সাড়ে চারটায় দুপুরের খাবার শেষ করলাম। হাত ধুতে গিয়ে পাশেই জানালায় দেখি আবার সেই বিরক্তিকর গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টি। অসহ্য! অসহ্য! অসহ্য! বান্ধবীদের সাথে বের হওয়ার কথা ছিল বিকেলের পর। সেই হিসেবে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বের হলাম। অবশ্য তাকে বৃষ্টি বলা যায় না, ক্ষুদ্র জলকণা পতন-ই হওয়া উচিত এর সার্থক নামকরণ। ঘন বর্ষণ না হলে কি হবে, রিকশার কোন দেখা নেই। অনেকদূর হেঁটে একটা রিকশা পেলাম। হুড আর তুললাম না। সাথে সাথেই এক বান্ধবীর ক্ষুদেবার্তা পেলাম, বৃষ্টি নাকি বাড়ছেই তাই বের হওয়া যাবে না। অপর বান্ধবীটি আগের জনমে আমার মতন পাগলাগারদের বাসিন্দা ছিল বলেই ফোন করে জানালো, সে আড়ং এর সাত তালায় সেভেনথ হেভেন এর বারান্দায় বসে বৃষ্টিতে ভিজছে, আমি যেন জলদি চলে আসি। অবশেষে, আশায় বুক বাঁধলাম, আমিও বুঝি কিছুক্ষণের  মধ্যে বৃষ্টি  বন্দনা করতে পারবো। আড়ং পর্যন্ত আর যেতে হলো না, অর্ধেক রাস্তা যেতেই, টাউনহলের কাছে বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম। আহারে, গত একটা মাস, যতবার মেঘের গর্জন শুনেছি, বাসার নিচে এসে দাড়াতাম ভিজবো বলে, কিন্তু কপালে জুটতো না এ বর্ষণ, বুকে রয়ে যেত চৈত্রের কাঠফাটা রোদে পোড়া হাহাকার। এখন আমার শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে অঝর জলরাশি। আহা! স্বর্গও মনে হয় এমনই কিছু হবে। রিকশায় বসে বৈশাখের ও বছরের প্রথম বৃষ্টিতে ভিজছি, শরীরে জড়ানো খাদি শাড়ি, শাড়ি জুড়ে লেখা রবিঠাকুরের গান,

“বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান–

     তুমি কি  এমন শক্তিমান!

আমাদের   ভাঙাগড়া তোমার হাতে এমন অভিমান–

              তোমাদের   এমনি অভিমান ॥

     চিরদিন টানবে পিছে,   চিরদিন   রাখবে নীচে–

     এত বল   নাই রে তোমার,   সবে না সেই টান ॥

শাসনে   যতই ঘেরো   আছে বল   দুর্বলেরও,

     হও-না   যতই বড়ো   আছেন ভগবান।

          আমাদের  শক্তি মেরে   তোরাও   বাঁচবি নে রে,

              বোঝা তোর   ভারী হলেই ডুববে তরীখান।”

তাইতো, “বোঝা তোর ভারী হলেই ডুববে তরীখান  ” – সত্যিই তাই হলো। আমার অভিযোগ-অনুযোগের বোঝা সইতে না পেরে আজ প্রকৃতি নিজের সব বিলিয়ে আমাকে এই বরিষাধারায় নিয়ে চলছে। এই পথ যদি না শেষ হয় – মনে হয় এমনই দিন, এমনই ক্ষণের জন্য গাওয়া হয়। তবে, গেয়েও লাভ হয় না, কারণ পথ শেষ হয়, আমিও যেমন গন্তব্যে পৌঁছালাম। আড়ং এ নেমে দেখি, অন্তত শ’খানেক মানুষ এ হঠাত বর্ষণ থেকে নিজেদের বর্ষবরণের সাজগোজ বাঁচাতে নিরাপদ স্থানে নিজেদের আড়াল করে রেখেছে। রাগ হলো না, দুঃখ হলো। এমন বৃষ্টিতে না ভেজা যে পাপ, এরা কি তা জানে না। যাই হোক, অন্যের হিসাব নিকাশ না করে, লিফট এ উঠলাম। এক তলা পার হতেই লিফট আটকে গেলো। অন্য দিন হলে, দুপুরে দেখা এক শালিকটিকে শাপ-শাপান্তে অতিষ্ট করে ফেলতাম। আজ মন খুব ভালো, তাই ধৈর্য ধরে লিফট ঠিক হয়ার অপেক্ষা আছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠিক হলো সব, আর আমি সপ্তম স্বর্গে পৌছালাম। সেভেনথ হেভেনের বাংলা হিসেবেই নয়, আজ এই স্থান আমার জন্য প্রকৃত-অর্থেই সপ্তম স্বর্গ।

এই রেস্টরেন্টের বারান্দাটার গ্রীল নেই, নীচ থেকে অর্ধেকটা কাঁচ দিয়ে ঘেরা, সামনেই সুপ্রশস্ত মানিক মিয়া এভিনিউ এর আলপনায় রাঙ্গা রাস্তা, আর যতদূর চোখ যায়, কেবলই সবুজ আর সবুজ। বারান্দায় বের হতেই, আবারো শরীরে পড়লো বৃষ্টির এলোপাতাড়ি আক্রমণ, সাথে বাতাসের তীব্র বেগ। এখানে তো আমি অসংখ্যবার এসেছি, এমন ভাবে বৃষ্টিতে ভেজা তো কখনো হয়নি। ঠিক যেমন অসংখ্যবার শরীরে শাড়ি জড়ালেও, কখনো বৃষ্টি স্পর্শ করেনি আমার শাড়িময় অবয়ব। ঝাপসা চোখে আমার সখীর দেখা পেলাম, সেও যেন এমন বৃষ্টি দেখে আজ এক বাঁধনহারা প্রাণ। আমার চোখে চোখ পড়তেই বলে উঠলো, আমিই তার সবচেয়ে প্রিয়, সবার চেয়ে প্রিয়। হবোই না বা কেন? কত-শত এমন ক্ষণ যে আমাদের বন্ধুত্বের সাক্ষী।নতুন বছরের প্রথম আলিঙ্গন তার কাছ থেকেই পেলাম আর বারান্দায় পাতা চেয়ার টেবিলের একটিতে বসে পড়লাম। জীবনের অর্থ কি – এ প্রশ্ন করে করে সবার মাথা নষ্ট করে দেই, কিন্তু এমন কিছু মুহূর্ত ক্ষণিকের জন্য হলেও আমার কৌতুহলী মনকে ক্ষান্ত দেয়। মনে হয় – এই তো জীবন, এই তো জীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য ও সার্থকতা। ঘন্টা-খানেক ভারী বর্ষণে জীবন-দর্শন এর ব্যবচ্ছেদ করে মনে হলো চা-কফি খেতে হবে। একটা কফি অর্ডার করে আবার কি মনে হলো, আমরা অর্ডার বাতিল করলাম, আর নিচে নামার প্রস্তুতি নিলাম। ঠিক তখনই আমার পাদুকাখানি নিজের জীবননাশের আভাস দিল। শাড়ি তুলে দেখলাম, আমার রুপালি রঙের জুতো ছিঁড়ে গেছে। এবার বসন্ত বরণেও আমার জুতো ছিড়ে গিয়েছিল, বর্ষবরণের দিনেও ছিঁড়ল। যেহেতু মন খুবই তুষ্ট, তাই ভেবে নিলাম, আমার সোনালী আভা দেয়া শাড়ির সাথে বেমানান রুপালি ্জুতোখানি প্রকৃতির মনে সয়নি, তাই এমন হলো। নিচে আড়ং এ নেমে এক জোড়া সোনালী সুন্দর জুতো কিনে ফেললাম। এবার একেবারে সোনালী আভা আর লালে সজ্জিত পায়ে নামলাম রাজপথে।

কোথায় যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে বের করলাম, রবীন্দ্র সরোবর যাই। রিকশা ঠিক করে রওনা দিলাম দু’জন। কিছু পথ যেতেই দেখি শরীরে কি যেন বাড়ি খাচ্ছে, বুঝতে বাকি থাকলো না যে শিলা বর্ষণ হচ্ছে। বান্ধবী বললো, শাড়ির আঁচল পেতে শিলা ধরতে। তাই করলাম। শাড়ির আঁচল পেতে দিলাম, আর প্রকৃতি করুণা বর্ষণ করলো শিলা-রূপে, তাই আমরাও আকাশপানে চেয়ে হা করে করুণা পান করলাম আর আমি জীবনে প্রথমবার শিলা মুখে দিলাম। কপালের লাল টিপকে আবিষ্কার করলাম ব্যাগের ভাজে, কখন যেন সে আমার ললাট ছেড়ে উঠে এসেছে, খেয়ালও তো করিনি। অতঃপর, ধানমন্ডি ৮ নাম্বার পৌঁছালাম, রবীন্দ্র সরোবর নামলাম এবং বুঝলাম কোথাও চা নেই। তবুও অনেক দূর হাটলাম, সরোবর আর সাত মসজিদ রোডের মাঝখানের ব্রীজটা পার হয়ে মাঝের দোকানগুলোর একটাতে বসলাম এবং চা না পেয়ে কফি দিয়ে শরীরকে একটু উষ্ণ করলাম। ব্রীজ পার হতে গিয়ে দেখলাম, বাংলা নববর্ষের প্রথম সূর্যাস্ত।লেকের উপর জলকণার পতনের সাথে অস্তপ্রায় সূর্যের আলো মিশে একাকার। গোধূলির এমন রূপ আগে দেখেছি কিনা মনে করতে পারছি না।  তিতকুটে কফি পান করে মন ভরলো না, তবে ঠান্ডাটা একটু কাটলো। এক প্লেট ফুচকা খেয়ে কফির বিশ্রী ফ্লেভার মুখ থেকে দূর করলাম। শেষ বিকেলের আলোয় কাটলো আমার স্মৃতিমুখর এক সন্ধ্যা। কিছুক্ষণ পর ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে, হেঁটে হেঁটে মেইন রোডের দিকে  এগিয়ে গেলাম। তবে, আমার বুকজুড়ে তখনো এক কাপ চায়ের হাহাকার। বুঝতে পেরে বান্ধবী আমায় নিয়ে গেলো আমার আজকালকার প্রিয় বেঙ্গল বইয়ে। বেঙ্গল বইয়ে আমার রোজকার জায়গা, বৈঠকখানাতে বসে চা-সিঙ্গারা অর্ডার করলাম। চা পানের মাধ্যমে আমার এ অপূর্ব দিনটির ষোলকলা পূর্ণ হল।

জীবনে অনেক বৈশাখ এসেছে, অনেক বৈশাখী বৃষ্টিতেই কত জলকেলি করেছি। তবে, এবারের মতন বর্ষবরণ কখনো করিনি। পহেলা বৈশাখ মানেই আমার কাছে ছিল সকালের স্নিগ্ধ বাতাস, বটমূলের গান, দুপুরের কাঠফাটা রোদ , বিকেলের আড্ডা আর রাতের দাওয়াত। অথচ, এবার বছরকে স্বাগত করলাম নতুন আঙ্গিকে।ভিন্ন এক বর্ষবরণের অভিজ্ঞতা হবে বলেই হয়তো, এবারের চৈত্র আমার গেলো বর্ষণহীন আর বৈশাখ শুরু হলো বৃষ্টি-বন্দনা দিয়ে।